একই আকাশের চাঁদ
উৎপল সরকার
ঢাকা শহর। মধ্যবিত্ত, ছিমছাম একটি বাড়ি। রেডিওতে বা ইউটিউবে খুব ধীরে ধীরে একটি গান বাজছে—
“ও আমার দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা। তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।”
রাইশা—‘গোলাপ’ বা ‘ঈশ্বরের উপহার’; এ নামের অনেক অর্থই করা যায়। কিন্তু এ গল্পের মূল চরিত্র রাইশা, ঢাকার মেয়ে। দাদির বাড়ি কিশোরগঞ্জে, বাংলাদেশে। দুই চোখভরা স্বপ্ন আর একবুক কোমল ভালোবাসা নিয়ে সে চলেছে ভারতে। তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করবে সে। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় যেন অনেক দিন ধরেই তাকে ডাকছে।
স্বপ্ন ও বাস্তব যখন হাত ধরাধরি করে চলে, তখন হয়তো মানুষও গোলাপ হয়ে যায়; মেঘের কোলে পেঁজা তুলোর মতো ভেসে বেড়ায়। মন উদ্বেলিত হয়ে ওঠে বাঁধনহারা আনন্দে। আর সেই আনন্দের আবেশে ডুবে রাইশা চলেছে দিল্লির পথে। সীমানা বা সংকীর্ণতার কোনো বাঁধন কোনো দিন স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারে না।
যাওয়ার আগের দিন রাতে ছাদে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রাইশা যেন পৌঁছে যায় দাদির বাড়ির পাশের মেঘনা নদীর চরে। এখানে আকাশে, বাতাসে, আলোয়, মেঘনার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে এক মায়াবী উদারতা আছে। সেই প্রকৃতি যেন চিরদিনের মতো তাকে আপন করে জড়িয়ে নিয়েছে।
প্রথমে গুনগুন করে, পরে উদাত্ত কণ্ঠে রাইশা গেয়ে ওঠে নজরুলের প্রেমগীতি—
“শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে, বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে। ভুলিও স্মৃতি মম নিশীথ-স্বপন সম...”
মেঘের ভেলায় ভাসতে ভাসতে রাইশা পৌঁছাল ভারতে। এখন শরৎকাল। পেঁজা তুলোর মতো সারি সারি সাদা-নীল মেঘ ভেসে চলেছে ভারত ও বাংলাদেশের আকাশজুড়ে।
আবীর—ভূগোলে অনার্স নিয়ে পড়তে যাবে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে যেন কোনো অলীক গীতবিতানের পাতা থেকে হেঁটে আসা মানুষ। তার দুই চোখে পদ্মা-গঙ্গার শেষ বিকেলের আলো ঝিলমিল করে। কণ্ঠে আব্বাসউদ্দীনের ভাটিয়ালি সুর, গায়ে শান্তিনিকেতনের খয়েরি মাটির গন্ধ, হৃদয়ে এক অবিভক্ত বাংলার নির্জন নদীতট।
এখনও তার শরীরে লেগে আছে কলকাতার পুরোনো বইয়ের দোকানের গন্ধ। শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করলেও প্রতি সপ্তাহে সে কলকাতায় ছুটে যায়—শুধু বইয়ের খোঁজে। তার পায়ের তলায় এখনও লেগে আছে কোপাই নদীর জল আর বালুর স্পর্শ।
আবীরের গলায় গানও খুব ভালো। দিল্লিতে পড়ার বহু দিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তার। আনন্দে সে গেয়ে ওঠে—
“তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম, নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমা নিশীথিনী সম। তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম...”
এই গান, কবিতা আর অসংখ্য স্বপ্ন নিয়ে সেও চলেছে দিল্লির পথে। যেখানে হয়তো অপেক্ষা করছে আরেকটি হৃদয়—তার অদেখা আলোর অপরূপ রূপ।
রাইশার ব্যাগে সব সময় চারটি বই থাকত—রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা, নজরুলের সাম্যবাদী, সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার বই এবং সুফিয়া কামালের সাঁঝের মায়া। ঢাকা থেকে দিল্লিগামী বিমানে বসে সে পড়ছিল সেগুলোই।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুফিয়া—এরাই তো তাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন দেশ ছেড়ে ভারতে পড়তে আসার। সুকুমার বড়ুয়ার কবিতার ছন্দ গুনগুন করে উচ্চারণ করতে করতে তার কণ্ঠে মিষ্টি সুর নেমে আসে—
“ধন্য সবাই ধন্য, অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে মাতৃভূমির জন্য।”
চুপিচুপি বলে রাখি, এর মধ্যেই রাইশা আর আবীরের পরিচয় হয়ে গেছে।
একদিন আম্বেদকর সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে দুজনেই একসঙ্গে হাত বাড়িয়েছিল সালমান রুশদির The Satanic Verses বইটির দিকে।
আবীর হালকা হেসে বলেছিল, —তুমি নাও। আমি পরে পড়ে নেব।
রাইশা ফিক করে হেসে বলেছিল, —চলো, একসঙ্গেই পড়ি।
আবীর হাত তুলে বসার জায়গার দিকে ইশারা করেছিল। ওরা পাশাপাশি বসে পড়তে শুরু করেছিল। সেদিন হয়তো রুশদির লেখা পড়তে পড়তেই তারা পৌঁছে গিয়েছিল সাদা মেঘের ছিটে দেওয়া নীল আকাশের কোনো মানসলোকে।
২০২৩-এর শরৎ। প্রকৃতি যেন মোলায়েম সকালের সূর্যকে তার নীল থালায় সাজিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরেছে।
জেএনইউ-এর লাল ইটের লাইব্রেরির সিঁড়িতে পাশাপাশি বসে আছে আবীর আর রাইশা। আবীরের পুরোনো নোটবুকের পাতা উল্টাতে উল্টাতে এক জায়গায় এসে রাইশার চোখ আটকে গেল।
সেখানে লেখা—
“আমার এ গানটুকু, শুধু তোমারি তরে।”
রাইশা গুনগুন করে লাইন দুটো গেয়ে উঠল।
আবীর হেসে ফেলল। হাসলে তাকে আরও সুন্দর দেখায়।
—যাক, আজ এই লাইনটা সার্থক হলো।
—এই না! ধুৎ!
বলেই বাম হাত দিয়ে আলতো করে একটি থাপ্পড় দিল সে।
তারপর লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। কিন্তু ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা টোল-ফেলা হাসিটা লুকিয়ে রাখতে পারল না।
ভালোবাসা তখন ডালপালা মেলেছে। সেই তরুচ্ছায়ায় দুটি মন স্নিগ্ধতার পরশে ভেসে যাচ্ছে, সব দেয়াল ভেদ করে। কে হিন্দু, কে মুসলমান—লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে থাকা ওদের মনে সে প্রশ্নের কোনো স্থান নেই।
ওরা তখন সীমান্ত অতিক্রমী ভালোবাসার ভেলায় ভেসে চলেছে।
মাঝেমধ্যে ক্যাম্পাসের পেছনের বটগাছের নিচে ক্লাসের ফাঁকে বা ক্লাস শেষে বসত তারা। দিনের অনেকটা সময় কেটে যেত সেখানে।
একদিন হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছে। দূরে মেঘের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে সূর্যাস্তের সোনালি আভা বৃষ্টিধারার আবেগের ওপর যেন ভালোবাসার মালা গেঁথে দিচ্ছে।
দুজন দাঁড়িয়ে আছে একই ছাতার নিচে।
আবীর ধীরে ধীরে বলল,
—রাইশা, জানো, তোমার চোখে যখন বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে, তখন মনে হয় আকাশ থেকে যেন কোনো তারা নেমে এসেছে।
রাইশা হেসে ফেলল। তারপর খানিকটা গম্ভীর হয়ে বলল,
—আবীর, আমি যখন তোমার দিকে তাকাই, তখন মনে হয় ঢাকার মতো এখানেও আমি খোলা আকাশ দেখতে পাই। তুমিই আমার আকাশ।
এই বলে সে আলতো করে আবীরের হাতটা ধরল।
এভাবেই তো ভালোবাসা হাত ধরে পথ চলে।
একদিন, এক সন্ধ্যায়, যমুনার ধারে।
সন্ধ্যাতারাগুলো তখন রক্তিম আভা ছড়িয়ে আকাশটাকে আরও মায়াময় করে তুলেছে। সন্ধ্যার পেয়ালাটি যেন চাঁদের আলোয় ধীরে ধীরে ভরে উঠছে। আবীর হঠাৎ রাইশার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। হাতে একটি ছোট্ট কাগজের নৌকা। সেটি রাইশার হাতে দিয়ে বলল,
—এটা আমি নিজে বানিয়েছি। তোমার জন্য।
রাইশা অবাক হয়ে নৌকাটি হাতে নিল। ভেতরে ভাঁজ করা একটি ছোট্ট কাগজ। খুলে দেখল সেখানে লেখা—
“ভালোবাসি তোমাকে। খুব, খুবই।”
রাইশার চোখে জল চিকচিক করে উঠল, যেন দীঘির জলে ভাসমান চাঁদের প্রতিবিম্ব।
সেদিন রাতে সুবর্ণরেখা হোস্টেলের ছাদে পাশাপাশি বসেছিল তারা। দুজনের মুখই আকাশের দিকে।
রাইশা একটি তারা দেখিয়ে বলল,
—আচ্ছা, যদি আমরা দুজন একই আকাশের দুটি তারা হতাম, তুমি কোনটা হতে চাইতে?
আবীর পাশ ফিরে অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
—আমি হতাম ওই উত্তরের তারা। তোমার সঙ্গে সঙ্গে চলে যেতাম তারাদের সেই দেশে।
রাইশা আলতো করে তার বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,
—আর আমি হতাম চাঁদ। প্রতিদিন তোমার আলোয় রাঙিয়ে উঠতাম।
দুটি অন্তরের ভালোবাসা যখন গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই বাইরে যেন ঝড়ের পূর্বাভাস শোনা যেতে লাগল।
পরদিন জেএনইউ-র গেটে কারা যেন পোস্টার সেঁটে দিয়েছে। সেখানে লেখা—
“বাংলাদেশি মুসলিম মেয়ের লাভ জেহাদ মানব না।”
সঙ্গে রাইশার ছবি।
পোস্টারটি দেখেই রাইশার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। লজ্জা, ভয়, অপমান—সব মিলিয়ে সে যেন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ল।
খবর পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আবীর ছুটে এল।
রাইশা তার দুই হাত শক্ত করে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
—আমি কি তোমার জীবন নষ্ট করে দিচ্ছি, আবীর?
আবীর তাকে বুকে জড়িয়ে নিল।
—তুমি আমার জীবন নষ্ট করছ না, রাইশা। বরং পূর্ণ করে দিচ্ছ। তুমি আমাকে আরও মায়াময় করে তুলেছ।
তারপর রাইশার থুতনিতে আলতো করে হাত রেখে মুখটা তুলে ধরল। চোখে চোখ রেখে বলল,
—শোনো, আমাদের সবার রবীন্দ্রনাথ কী লিখেছিলেন, মনে আছে?
“আমার এই দেহখানি তুলে ধরো, তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো।”
একটু থেমে আবার বলল,
—আমি তোমার সব কষ্ট, সব দুঃখ নিজের করে নেব। শুধু তুমি আমার পাশে থেকো।
কিন্তু ঝড় থামল না।
এবার ঝড় উঠল সীমান্তের অন্য প্রান্তেও।
একদিন রাইশার চাচা ফোন করলেন। কণ্ঠে রাগ আর হতাশা।
—তোর সেই হিন্দু বন্ধু? তার দেশ আমাদের মসজিদ ভেঙেছে। তুই এখন তার সঙ্গে সম্পর্ক করছিস? এই শিক্ষা পেয়েছিস? আর দেখ, তোর নামেই পোস্টার সাঁটা হয়েছে। এই দেশ আর ওই দেশ কোনো দিন এক হবে না।
রাইশা কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর স্পষ্ট অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—চাচা, আমি যাকে ভালোবাসি, সে কোনো দিন আগুন জ্বালাবে না। সে আমার হাত ধরে আগুন নেভাতে চায়।
ফোন রাখার আগে চাচা বললেন,
—যা খুশি কর। কিন্তু জেনে রাখিস, ফতোয়া বেরোচ্ছে দুই পারেই।
সেদিন রাতে রাইশার আর ঘুম এল না।
চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল দিনের ঘটনাগুলো। একসময় সে জীবনানন্দের বই খুলে বসে। মোলায়েম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে পড়তে থাকে—
“আমি যদি মরে যাই, আমার মৃত্যু যেন হয় আলোর মতো।”
তবু পৃথিবীতে ভালো মানুষ ছিল, এখনও আছে।
সংঘাত যখন চরমে পৌঁছাল, তখনই এগিয়ে এল কিছু মানুষ।
জেএনইউ-এর অধ্যাপক রাও, অধ্যাপক নামধারী এবং আরও অনেকে তাদের পাশে দাঁড়ালেন।
ঢাকা থেকে ফোন করলেন রাইশাদের পাশের বাড়ির তুতো আঙ্কেল দীপক।
—চিন্তা করিস না, মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার মেয়ে মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করেছে। আমাদের বাড়িতে পূজাও হয়, নামাজও হয়। যার যার বিশ্বাস, তার তার মতো।
আবীরের মা-ও ফোন করলেন।
—রাইশা, আমি তোমার জন্য মানত করেছি। কোনো অবস্থাতেই ভয় পাবে না।
একটু থেমে বললেন,
—জানো মা, রবীন্দ্রনাথের একটা লাইন খুব মনে পড়ে—
“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।”
তারপর আবার বললেন,
—কিন্তু আমরা একলা নই। দুই দেশেই আমরা অনেক।
সেই বিশ্বাস থেকেই ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক আর মুক্তচিন্তার মানুষদের উদ্যোগে গড়ে উঠল একটি প্ল্যাটফর্ম—
“Love Beyond Borders”।
পরদিন আবার মুখোমুখি হলো আবীর ও রাইশা। ক্লাসে যাওয়ার আগে।
আবীর তার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,
—রাইশা, যদি কোনো দিন কেউ আমাদের আলাদা করার চেষ্টা করে, তুমি কী করবে?
রাইশা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি তোমার নাম ধরে ডাকব। আর যদি সাড়া না পাই, আমি আকাশ ফুঁড়ে তোমার কাছে চলে আসব। কারণ তুমি আমার বাতাস। তুমি না থাকলে আমি শ্বাস নিতে পারব না।
আবীর নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—যত ঝড়ই আসুক, আমি তোমার ছায়া হয়ে থাকব। এমনকি মৃত্যুর পরেও।
এইসব এলোমেলো ঝড় যখন দুই দেশেই বয়ে যাচ্ছে, তখন শীতকাল নেমে এসেছে।
কয়েক দিন পর জেএনইউ-এর খোলা ময়দানে “Love Beyond Borders”-এর বিশাল অনুষ্ঠান।
অধ্যাপক, ছাত্রছাত্রী, গবেষক, শিল্পী, লেখক—অসংখ্য মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছেন। দেশ-বিদেশের বহু সংবাদমাধ্যমও এসেছে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করতে।
চারদিকে উৎসবের আবহ।
অনুষ্ঠান শুরু হলো।
সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও মানবিক ঐক্যের গুরুত্ব নিয়ে অধ্যাপক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা বক্তব্য রাখলেন।
এরপর মঞ্চে ডাকা হলো আবীর ও রাইশাকে।
হাতে হাত রেখে তারা যখন মঞ্চে উঠল, চারদিকে করতালির ঢেউ বয়ে গেল।
মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে আবীর প্রথম কথা বলল।
—আসুন, আমরা সবাই একবার দাঁড়াই। রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করি। তিনি ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশকেই জাতীয় সংগীত উপহার দিয়েছেন। ভালোবাসা, মানবতা ও মানুষের জয়ের যে গান তিনি গেয়েছেন, তা যুগ যুগ ধরে আমাদের পথ দেখাবে।
সকলেই দাঁড়িয়ে পড়ল।
আবীর গেয়ে উঠল—
“জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে, ভারতভাগ্যবিধাতা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাট, মরাঠা, দ্রাবিড়, উৎকল, বঙ্গ...”
তারপর রাইশা সবার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইল—
“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি...”
গান শেষ হলে আবীর ও রাইশা মাথা নত করে সবার অভিবাদন গ্রহণ করল।
চারদিকে তখন হাততালির ঝড়। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে আলো ঝলমল করছে চারপাশ।
আকাশজুড়ে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ ভেসে আসছে। যেন অদৃশ্য কোনো আশীর্বাদ নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে।
আবীর আর রাইশা—ভালোবাসার সাগরে যাত্রা করা দুটি তরুণ প্রাণ—হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল।
তাদের দুই চোখ বেয়ে নেমে এল অশ্রু। যেন শ্রাবণের ধারার মতো।
একঝাঁক সাদা পায়রা, যারা এতক্ষণ মুক্তমঞ্চের পেছনের গাছগুলোতে নীরবে বসে ছিল, হঠাৎ ডানা মেলে উড়ে গেল দূরের নীলাভ আকাশে। সেই আকাশে, যেখানে কোনো সীমানা নেই; যেমন ভালোবাসারও কোনো সীমানা থাকে না।
মেঘেরা যেন ডানা মেলে ভালোবাসার জয়গান গাইতে লাগল।
আর মাইকের সুরেলা ধ্বনিতে ভেসে এল সুকুমার বড়ুয়ার কবিতার সেই পঙ্ক্তিগুলো—
“এমন যদি হতো, ইচ্ছে হলে আমি হতাম প্রজাপতির মতো। নানান রঙের ফুলের ’পরে বসে যেতাম চুপটি করে, খেয়ালমতো নানান ফুলের সুবাস নিতাম কত।”
====================
লেখক ও প্রেরক :-উৎপল সরকার, নিউটাউন, আলিপুরদুয়ার, জেলা :-আলিপুরদুয়ার।

