ইলিশ আর বাঘমামা
অঞ্জনা মজুমদার
রিভুর মেজমামা ডঃ সাম্য বোস ব্রেকফাস্ট টেবিলে বললেন, এবার ইলিশ উৎসবে সুন্দরবনে বেড়াতে যাবো। সিমি আর রিভুর প্রথম সেমিস্টার হয়ে গেছে তাই তারা তো যাবেই। ছোটমাসী কমলিনীর স্কুলে তিনদিন ছুটি, ছোটমামা বিতানেরও কলেজে ছুটি তাই মোট পাঁচজনের দল মেজমামার টাটা সুমো করে নামখানা পৌঁছে গেল। ছোটমামা গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
রাস্তার পাশে একটা ধাবায় কচুরি, আলুরদম,আর জিলিপি খেয়ে ব্রেকফাস্ট করা হল। সিমি দুটো জিলিপি বেশি নিয়ে গাড়ির পেছনে কাকে যেন দিয়ে এল। কমলিনী দেখেও যেন দেখলেন না।
নামখানায় নামতেই দুজন লোক মেজমামার দিকে এগিয়ে এলো।
একজন ধুতি পাঞ্জাবী পরা ভদ্রলোক বললেন,
নমস্কার ডাক্তারবাবু, আপনাদের সুন্দরবনে স্বাগত।
মেজমামা বললেন, নমস্কার সমরেশবাবু। আমরা আপনাদের সুন্দরবনে বেড়াতে এলাম। শুনলাম নাকি মাতলা নদীতে জোয়ারের সময়ে ভাল ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে?
সমরেশবাবু হেসে বললেন, তাইতো আপনাদের এই ট্রিপের নাম দিয়েছি ইলিশ উৎসব। সঙ্গে সুন্দরবনের বাঘ দেখাও হবে। এই হল আবদুল, আপনাদের লঞ্চের মানে সাগরনীলের সারেং।
এগিয়ে নদীতীরে দেখা গেল ছোট্ট কিন্তু সুন্দর করে সাজানো নীল রঙ করা একটা লঞ্চ। বোর্ডে লাল রঙে লেখা সাগরনীল। হেলানো পাটাতনের ওপর দিয়ে লঞ্চের ডেকে উঠতেই দুটো অল্প বয়সী ছেলে এগিয়ে এলো। ডেকের উপর পাতা টেবিল চেয়ার দেখিয়ে একজন বলল, আমি রামু আর এ হল যদু। আপনারা বসুন, এককাপ চা খেয়ে একটু রেস্ট নিন। তারপর লাঞ্চ দেবো।
যদু গাড়ি থেকে জিনিসপত্র লঞ্চে নিয়ে এলো।
লঞ্চ ছেড়ে দিল। নদীর তীরে দুপাশের দৃশ্য বদলাতে লাগল।
সমরেশবাবু বললেন, আমি খুব দুঃখিত। একটা জরুরি কাজের জন্য লাঞ্চের পর আমাকে নেমে যেতে হবে। তবে আবদুল, রামু আর যদু আপনাদের মাছ ধরা, হরিণ, কুমীর সব দেখাবে। আর ভাগ্য ভালো থাকলে বনের রাজার দেখাও পেতে পারেন।
ডেকের ওপর টেবিলে ভুরিভোজ হল। মুগডাল, ঝিরি ঝিরি আলুভাজা,পার্শে মাছের ঝাল, গলদা চিংড়ির মালাইকারি, আর আমের চাটনি। শেষপাতে দই আর মাখা সন্দেশও ছিল।
খাওয়া হয়ে গেলে এক ধারে লঞ্চ থামিয়ে সমরেশবাবু নেমে গেলেন। লঞ্চ নদীপথে এগিয়ে চললো, দুপাশে জঙ্গল ঘন হচ্ছে।
রিভু চেঁচিয়ে উঠল, সবাই দেখো নদীর ধারে দুটো কুমীর রোদ পোহাচ্ছ। গাছের ডালে কত বাঁদর!,
সিমি হাততালি দিয়ে উঠলো, ওই দেখো দাদাভাই বনের ধারে একপাল হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ভাই বোনের আনন্দ দেখে মেজমামা মুচকি হাসলেন, বাকি রইল ইলিশ মাছ ধরা আর বাঘ দেখা।
কমলিনী হাসলেন, বাঘ দেখে ভয় পাবে না তো মেজদাদা?
মেজমামা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, ভয় পাবো আমি? আমি মড়া কাটতে ভয় পাইনি। আর জঙ্গলের বাঘকে ভয় পাবো?
ছোটমামা হেসে ফেললেন, তবে সবাই বলে যে তুমি নাকি প্রথমবার মড়া কাটতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে? সার্জারিতে টেনেটুনে পাশ করেছো?
কমলিনী বললেন, তবে তোমার ডায়গোনিসিস খুব ভালো আর স্মৃতি শক্তিও অসাধারণ। তুমি মেডিসিনের ভালো ডাক্তার। তবে আমি জানি বাঘ দেখে তুমি ভয় পাবেই।
মেজমামা ভাই বোনের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন।
একটু বেলা পড়ে এসেছে রামু আর যদুর ব্যস্তসমস্ত গতিবিধি। সারেং আবদুল লঞ্চ থামিয়ে দিল। জায়গাটায় নদী বেশ সরু। একটু দূরে নদীর তিনভাগের মূল ধারাটি সাগরে মিশেছে। তবে এখন জোয়ারের জল বাড়ছে হু হু করে। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় নদীর জলে চিকচিক করছে কি?
মেজমামা বললেন, ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নদীতে ঢুকছে।
রামু আর যদু জাল ফেলল। সবাই লঞ্চের রেলিং এ ঝুঁকে পড়ল। প্রথমবার জাল টেনে তুলতে মাত্র একটা ইলিশ উঠল। হতাশ মেজমামা চেয়ারে বসে পড়লেন।
পরের বার জাল টানতে গিয়ে যদু থেমে গেল। রামু বলল, কই টান? এবারে বেশি মাছ আছে।
যদু হাত দেখাল, নদীতে জল খেতে এসেছে বাঘিনী আর তিন ছানা।
ছোটমামা ক্যামেরা তাক করেছেন। ছোটমাসী মোবাইলই ক্লিক করছেন। রিভু সিমি জালের মাছের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাঘের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বাঘিনীও এদিকে তাকিয়ে আছে।
মেজমামা চেয়ার থেকে উঠে রেলিং এর কাছে এসে কি দেখছিস রে তোরা? সবার দৃষ্টি অনুসরণ করে নদীর তীরে তাকাতেই রিভু বলল, মেজমামা বাঘ! সেই সময়ে যদু রামু জাল টেনে তুলতে একসাথে দশটা মাছ জালে। সেগুলো ডেকের উপর রাখা বড় গামলায় রাখতেই কোথা থেকে কিছু একটা লাফিয়ে ডেকে পড়ল।
আর মেজমামা বাঘ বলে ডেকের ওপর নেতিয়ে পড়ে গেলেন।
দূরে নদীর তীরে বাঘ গর্জন করে উঠলো আর মেজমামার মাথার পাশে একটা ইলিশ মাছ দুটো থাবার মধ্যে নিয়ে ছোটমাসীর আদরের মিনি বেড়াল আওয়াজ করে উঠল, মিঁয়াও।
সারেং আবদুল লঞ্চে স্টার্ট দিল। বাঘিনীও ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে তার ছানাদের নিয়ে জঙ্গলের দিকে ফিরে গেল।
চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে মেজমামা চোখ মেললেন। চারিদিকে তাকিয়ে ইলিশ মাছ কোলের কাছে নেওয়া মিনিকে দেখে আঁতকে উঠলেন, এটা কি? এখানে এলো কি করে?
ছোটমামা হো হো করে হেসে ফেললেন। বাঘ নয়, আমাদের মিনি।ছোড়দি ওকে ঝুড়ি করে নিয়ে এসেছে। সিমি খেতে দিয়েছে।
মিনি বেড়াল গলা ফুলিয়ে আবার আওয়াজ করে সমর্থন করল, মিঁয়াও, মিঁয়াও।
============================
অঞ্জনা মজুমদার
এলোমেলো বাড়ি
চাঁদপুর পল্লি বাগান
পোঃ রাজবাড়ি কলোনী
কলকাতা ৭০০০৮১
