ছোটগল্প ।। সম্পর্ক ।। শংকর ব্রহ্ম

 

 সম্পর্ক  

  শংকর ব্রহ্ম


এক).


                    বাবার মৃত্যুর পর মা অসহায় হয়ে ভেঙে পড়লেন। দিশেহারা হয়ে গেলেন একেবারে। বাবার তখনও মরার বয়স হয়নি। তখন তার বয়স মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়স। রোগা পাতলা চেহারা। বাইরে থেকে দেখে মনে হতো মানুষের চামড়া দিয়ে হাড়ের একটা কাঠামো মোড়া। ওই চেহারা নিয়েই তিনি রিক্সা চালাতেন। অতিরিক্ত পরিশ্রম আর সময় মতো  খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাক না করায়, বুকের ভিতর  ক্ষয়রোগের জীবাণু বাসা বেঁধে ছিল। গোপনে বংশ বিস্তার করেছিল। বাবা সেটা টের পেলেও সংসারের কথা ভেবে, তা নিয়ে তেমন গুরুত্ব দেননি। খুক খুক কাশি তার লেগেই ছিল। মা তাকে ডাক্তার দেখাতে বলত, বাবা মাছি তাড়াবার ভঙ্গি করে, সে কথা উড়িয়ে দিতেন। বাবার স্বভাব ও চরিত্রের কথা ভেবে, সে সময় মা  সেটাকে অস্বাবিক কিছু ভাবেননি। একদিন কাশতে কাশতে বাবার গলা দিয়ে রক্ত পড়ায়, মা তখন তাকে অনেক পীড়াপীড়িতে শেষে ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন রকম পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে ডাক্তার বাবার বুকের একটা এক্সরে করে এনে তাকে রিপোর্ট দেখাতে বলেন। মা তাই করেন। ডাক্তারবাবু সেই রিপোর্ট ভাল করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ভাল করে দেখে মাকে জানান, বাবার টি.বি হয়েছে।

বাবাকে যাদবপুর টি.বি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিয়ে আসা হয়। সেখানে তার চিকিৎসা বেশ ভালই চলছিল । আর সংসার চালানোর জন্য মা দু'টি বাড়িতে রান্নার কাজ নেন। একটি বাড়িতে সকালে কাজে যেতেন। অন্য বাড়িতে সন্ধ্যার সময়। আমরা তখন থাকতাম পল্লীশ্রীতে নিজেদের বাড়িতে।

                   মা বাবা আদর করে তাদের প্রথম সন্তান, আমার দাদার নাম রেখেছিল কালাচাঁদ।  আর আমার নাম রেখেছিল ভোলানাথ। ধীরে ধীরে সেই নামের  অপভ্রংশ হয়ে, আমার ডাক নাম হয়ে ওঠে ভোলা। আর দাদার নাম হয়ে যায় কালা।

আমার দাদা কালাচাঁদের বয়স এখন ষোল বছর।  মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। আর আমি ক্লাস নাইনে পড়ি।


                       দাদা মাঝে মাঝে যাদবপুর টি.বি হামপাতালে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেত। কোনো কোনও দিন আমিও তার সঙ্গে যেতাম।

দাদার মাধ্যমিক পরীক্ষা এসে পড়ায়, দাদা কিছুদিন তার খবর নিতে যেতে পারেনি। একদিন অকস্মাৎ হাসপাতাল থেকে খবর এলো আমার বাবা ঈশ্বর চন্দ্র দাস এক্সপায়ার করেছেন।  তিনি আর নেই, মা সে কথা শুনে, মন থেকে প্রথমে মেনে নিতে পারেননি। মাযের নাম পার্বতী দাস।

                      বাবার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সেই সময় বাবার ছোট বোন ভবতারিণী পিসি বনগাঁ থেকে আমাদের বাড়িতে চলে আসেন। দু'বছর আগেই তিনি তার স্বামী ভবেশ মিত্রকে হারিয়েছেন। পিসেমশাই অন্যের জমিতে চাষের কাজ করতেন। বর্ষার মধ্যে একদিন চাষের কাজ করতে গিয়ে, তার ডান পায়ে সাপ ছোবল দেয়। সেখানে দু'টি দাঁত বসে গিয়ে সেখান থেকে কপালের লাল টিপের বিন্দুর মতো দু'ফোটা রক্ত বের হয়। কাছাকাছি কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতাল না থাকায়, পাশের গ্রামের নামকরা ওঝা নারদকে ডেকে আনা হয়। ওঝা এসে প্রথমেই পিসেমশাইয়ের হাঁটুর নীচে পায়ের নলা বা দাবনায়, শাড়ির পাড়ের কাপড় দিয়ে শক্ত করে একটা বাঁধন দেয়। তারপর নানা রকম ভঙ্গি করে  মন্ত্র আওড়িয়ে, তিন বার 'মা মনসার জয়' বলে হুংকার ছেড়ে ঝাঁড়ফুক শুরু করে। এইভাবে সে প্রায় এক ঘন্টা চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি সে। পিসেমশাইকে বাঁচাতে পারেনি। ভবতারিণীর ডাক নাম ছিল শান্তা। শান্তা পিসি বিধবা হলেন। তাদের কোনও সন্তান হয়নি। তিনি থাকতেন বনগাঁয়। বাবার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তিনি বনগাঁ থেকে এসে আমাদের বাড়িতে ওঠেন। তাতে অনেকটা মার কাজের অনেকটা সুরাহা হলো। তাছাড়া, মায়ের নিঃসঙ্গতা কাটাবার জন্য তিনি যেমন মায়ের সঙ্গ দিতেন, তেমনই হাতে হাতে সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করতেন। পিসিমা ছিলেন ভীষণ নরম মনের আর মধুর স্বভাবের মানুষ। এখানে এসে তিনি তার ব্যবহারে আমাদের মন জয় করে নিয়ে ছিলেন। কিন্তু দাদার মনে কেন যেন পিসিমাকে নিয়ে একটা খচখচানি ভাব ছিল। সে কিছুতেই পিসিমাকে এই সংসারে  মেনে নিতে পারছিল না। 

                      এরমধ্যে মা আমাদের প্রায়ই শোনাতেন, বাবা নাকি মাঝে মাঝে তাকে স্বপ্নে এসে দেখা দেন। তাকে যেন কিছু বলতে চান। কিন্তু তিনি কী যে বলেন, বোঝা যায় না। ঠোঁট দু'টি কেবল নড়ে উঠে, বিড়বিড় করে। মার ধারণা বাবা আমাদের আশে পাশেই কোথাও আছেন। ইচ্ছে করে আমাদের দেখা দেন না।

                       আমি সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়, পাড়ার সমর কাকুর দোকানে একটা খাতা কিনতে গিয়ে শুনলাম, তার এক পিসিমা নাকি কাশী যাবেন। মায়ের মনে শান্তি ফেরাবার জন্য দাদার সঙ্গে পরামর্শ করে, সমর কাকুর পিসির সঙ্গে মাকে কাশী পাঠাবার ব্যবস্থা করা হল। ঠিক হল, মা কাশী গিয়ে যদি বাবার নামে পিন্ড দিয়ে আসে, তা'হলে হয়তো বাবার আত্মা মুক্তি পেয়ে,  আর স্বপ্নে এসে মার সঙ্গে দেখা করবেন না। আমাদের যুক্তি শুনে মায়েরও মন সে ব্যাপারে বেশ নিশ্চিন্ত হয়েছে মনেহয়। 

                         সমর কাকুর পিসিমার সঙ্গে মা কাশী যাবেন ঠিক হল। তিনিও মাকে তার কাশীবাসের সঙ্গি হিসাবে পেয়ে, খুব খুশি হলেন। দিন ঠিক করে দু'জনে কাশীর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন। দিন সাতেক পরে মা, বাবার সব ক্রিয়া-কান্ড সেরে, কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন করেে মনে শান্তি নিয়ে ফিরে এলেন। ফেরার সময় বড় বেলের আকারের একটা পেয়ারা কাশী থেকে আমাদের জন্য কিনে এনেছিলেন। পেয়ারাটা ভাগ করে বাড়ির সকলে মিলে আমরা আনন্দ করে খেয়েছিলাম। তার দানাগুলি রান্নাঘরের পাশে ফেলে দেওয়া হযেছিল। বর্ষাকাল শেষ হতেই দেখা গেল তার থেকে অঙ্কুর বের হয়েছে। দেখতে দেখতে সেগুলি চাড়া গাছের আকার নিল। তার থেকে একটি ডাটো চাড়া তুলে এনে মা বাড়ির বাঁ পাশের সীমানা ঘেষে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। গাছটি ছিল মায়ের কাছে

বাবার স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ। মা তার কিছুদিন পর হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। 

                         শখ করে মায়ের হাতে লাগানো,  কাশীর পেয়ারা গাছটিতে সবে ফুল ধরেছে। গাছটায় কত বড় বড় পেয়ারা হবে, কে জানে? ভিতরের শাঁসটা লাল। 

                          বড়দা যখন পাকা ঘর তুলবার জন্য, নির্মমভাবে  গাছটা কেটে ফেলার কথা বলেছিলেন, আমি খুব আপত্তি করার কথা ভেবেছিলাম। বলবো ভেবেছিলাম মায়ের হাতে শখ করে লাগানো পেয়ারাগাছটা দাদা তুমি কেটো না। তখন আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু সেকথা সে আমি বলতে পারেনি। আর বলবোই বা কাকে? বুকের ভিতরটা ভেঙে খান খান হয়ে গেছিল। একা একা কষ্ট পেয়েছিলাাম। কেউ তার ভাগীদার হয়নি। কাশী থেকে আনা পেয়ারাটার স্বাদ গুড়ের মতো মিষ্টি ছিল। এ'টার স্বাদ কেমন হত, কে জানে?  দূর দূরান্ত থেকে কত পাখি উড়ে এসে গাছটায় বসত। ভোরবেলা দোয়েল পাখির শিশে আমার ঘুম ভাঙত। তারপর ঝাঁকে ঝাঁকে বুলবুলি, টিয়া, শালিক, চড়াই আরও কত পাখি আসত। গাছটায় বসে দু'দন্ড তারা গাছটার সঙ্গে হুটোপুটি করে আবার কোথায় উড়ে চলে যেত। বড়দাও সে কথা জানে। তবু সে গাছটাকে রেহাই দিল না। 


                  গাছটা কাটার পর থেকে পাখিরা আর কেউ আসে না। আসবেই বা কি কারণে? বসবে কোথায়? কার সঙ্গে হুটোপুটি করবে? তাদের জন্য কি দাদার একটুও মন খারাপ হয় না? আমি জানি না। কিন্তু পাখিগুলির জন্য আমার নিজের খুব খুব মন খারাপ হয়।

                    মা মারা যাওয়ার পর, দাদা পঞ্চায়েত মেম্বারদের ডেকে জমিটা দু'ভাগে ভাগ করে ফেলেন। পিসিমা এটা মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু কেন? আমি তা জানি না। এরপর পিসিমা যেন আমাকে আগের চেয়েও বেশি করে আকড়ে ধরার চেষ্টা করতে লাগলেন। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ অদ্ভূত মনে হয়েছিল। কিন্তু আমি তা প্রকাশ করুনি। 

                পেয়ারা গাছটা দাদার অংশে পড়েছিল।

তাই আমার মন খারাপ হলেও, দাদাকে পেযারা গাছটা না কাটার বলে কোনও লাভ হত না। দাদা নিজের জন্য পাকা বাড়ি তুলবে। বাড়ি তোলার পর বিয়ে করবে। দাদা মাধ্যমিক পাশ করার পর জোম্যাটো কোম্পানীতে হোম ডেলিভারির একটা কাজ পেয়েছো। সেখান থেকে ভালই আয় হয় মনেহয়। 


দুই).

 

                    আমি নাইন পাশ করার পর মা মারা যায়। আমার আর পড়াশুনা করার কোনও সুযোগ ছিল না। তারপর অনেক কাজ-কর্মের খোঁজ করেছি। শেষপর্যন্ত কোনও কাজ-কর্মের জোগাড় করতে না পেরে, অবশেষে বাবার মতো রিক্সা ভাড়া নিয়ে চালাতে শুরু করেছি। তবে বাবার মতো আমি না খেয়ে থাকি না। দিনের শেষে মালিকের পাওনা  ভাড়া শোধ করে দেওযার পর, যা টাকা হাতে থাকত তার অনেকটাই খেয়ে ফেলতাম। বাকি টাকা এনে পিসিমার হাতে তুলে দিতাম। 


                      এইভাবে বেশ চলছিল। দাদা পাকা ঘর তুলে, সন্তোষপুর থেকে নিজের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করে পাকা ঘরে এনে তুললেন। তা'তে পিসিমা মনে মনে ক্ষুন্ন হলেন। দাদার সাথে কথা-বর্তা কমিয়ে দিলেন। কোনও প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। এইভাবে দাদার সঙ্গে আমাদের দূরত্ব তৈরী হল। বৌদি যেমন সুচারুরূপে দাদার সংসার সামলাতো। পিসিমাও তেমনভাবে আমার সংসার সামলাতেন। 

                           এইভাবে বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। দাদার একটি পুত্র সন্তান হল। তারও কিছু বছর পর, পিসিমা ক্যানসারে আক্রান্ত হলেন। প্যানক্রিয়াসে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে দেখিয়ে,  সেখানেই রে দেবার ব্যবস্থা শুরু হল তার। পিসিমাকে সুস্থ করে তোলার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। দাদাকে সে কথা জানিয়ে কোনও লাভ হল না। সে পিসিমার জন্য টাকা খরচ করতে রাজি হল না। বলল, তার ছেলে হয়েছে। এখন তার জন্যই অনেক খরচ আছে। তারপর তার ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাতে হবে। আমি পিসিমার চিকিৎসার জন্য আমার জমির অংশ বিক্রি করে দেব ঠিক করলাম। সেকথা জানতে পেরে দাদা একদিন আমায় বলল, অন্যের কাছে জমি বিক্রি না করে, আমার কাছে কর। বাবা মার সম্পত্তি অন্যের কাছে না গিয়ে, তাহলে পরিবারের একজনের কাছে থাকবে। দাদার কাছে কম দামে জমি বিক্রি করে, আমি পিসিমাকে নিয়ে বিদ্যাসাগর কলোনীতে বস্তির এক ভাড়া ঘরে এসে উঠলাম। দাদার কাছে জমি বিক্রি করা টাকায় পিসিমারর চিকিৎসার খরচ

চালাতে লাগলাম। টাকা ফুরিয়ে আসতে লাগল।

একদিন পিসিমা আমায় ডেকে বললেন, এবার তুই একটা বিয়ে কর। আমি আর বেশি দিন নেই রে ভুলু। 

চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে 'রে' নিতে যাওয়ার সময় পিসিমার সঙ্গে সেই হাসপাতালের একজন আয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে ভাল সম্পর্ক

গড়ে ওঠে। তার নাম রাণু সাহা। পিসিমা একদিন হাসপাতালে থেকে রে দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় রাণুকে এই বাড়িতে নিয়ে এলেন। মনে মনে আশা রাণুকে দেখে ভুলু বিয়ে করতে নারাজ হবে না।

ভুলু রিক্সা নিয়ে বাড়ি ফিরে অচেনা একটি মেয়ে রাড়িতে দেখে ভীষণ অবাক হয়। গামছা দিয়ে ঘাড় গলার ঘাম মুছে সে পিসিমাকে ডাক দেয়।

একগাল হাসি নিয়ে পিসিমা ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে বলল, আয় ভুলু ঘরে আয়।

তারপর মেয়েটিকে দেখিয়ে বলে, এর নাম রাণু।

তোকে এর কথা বলেছিলাম। হাসপাতালে 'রে' দিতে গিয়ে আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। সেখানে আয়ার কাজ করে। ওর মা বাবা কেউ নেই। মামা মামির কাছে থাকে। তারা ওকে বিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেছেন, বয়স্ক একজন দোজ বরের সঙ্গে। তুই ওকে বিয়ে করে, তার হাত থেকে ওর জীবন বাঁচা।

                         পিসিমার এই অনুরোধ সে উপেক্ষা করতে পারে না। ভোলানাথ রাজি হয়। একটা শুভদিন দেখে পিসিমা তাদের চারহাত এক করে মিলিয়ে দেন। ভোলানাথ রাণুকে বিয়ে করে সুখি হয়। পিসিমা তার কিছুদিন পরে মারা যান। রাণু খুব কেঁদে ছিল। ভোলানাথ তার কান্না

থামাতে পারছিল না।

                        তারও দু'বছর পর রাণুর একটি কন্যা সন্তান হয়। তার নাম রাখা হয় স্বপ্না। ওদের দু'জনের স্বপ্ন ছিল সে। রাণু বলে সে দেখতে একেবারে পিসিমার মতো হয়েছে। হাবভাবও তারই মতো। তারই মতো স্বপ্না নরম মনের আর মধুর স্বভাবের। সকল প্রাণীর উপর তার মায়া।

একদিন বর্ষার সময় কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে একটা শালিক পাখির ছানা মাটিতে পড়ে গিয়ে চিঁহি চিঁহি করে ডাকছিল। সেই ডাক শুনতে পেয়ে স্বপ্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে, পাখিটাকে উদ্ধার করে, গরম দুধ খায়িয়ে পাখিটাকে বাঁচিয়ে ছিল। কয়েকদিনের মধ্যে পাখিটা সুস্থ হলে উঠলে তাকে নিয়ে গিয়ে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটায় রেখে এসেছিল।

                         ধীরে ধীরে সেও বড় হয়ে ওঠে। ছয় বছর বয়সে তাকে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। ক্লাস ফোরে ভাল ফল করার পর, তাতে নিয়ে গিয়ে আনন্দ আশ্রম গার্লস স্কুলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সে পড়াশুনায় খুব আগ্রহী ছিল। ক্লাসে দিদিমণিরা যা পড়াত সে তা খুব সহজেই বুঝে যেত। বেশি বেগ পেতে হত না। মনে রাখতে পারত। ভুলে যেত না।

                         একদিন ভোলানাথ খবর পায়, দাদা কালাচাঁদ জোম্যাটো কোম্পানী থেকে পার্শেল নিয়ে তা, কাস্টমারের বাড়িতে ডেলিভারি দিতে যাবার সময় রোড এক্সিডেন্টে আহত হয়ে বাঙুর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একটা মালবাহী লরি একটা বাসকে পাশ কাটিয়ে এসে  দাদার বাইকে পিছন থেকে এসে জোরে ধাক্কা দেয়। দাদা বাইক থেকে রাস্তায় গিয়ে পড়ে। দাদা মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। অনেক রক্তক্ষরণ হয় মাথা থেকে। দাদাকে রাস্তার লোকজন ধরাধরি করে ট্যাক্সিতে তুলে নিয়ে গিয়ে বাঙুর হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। ভোলানাথ তার সঙ্গে দেখা করতে যায়। গিয়ে শোনে দাদার অবস্থা খুব ভাল নয়। নাকে মুখে নানা রকম নল গোঁজা। দাদার জ্ঞান নেই। রিক্সা চালানো বন্ধ রেখে রোজ বিকালে ভোলানাথ দেখা করতে যায়। একদিন গিয়ে শোনে দাদা আর বেঁচে নেই। সেদিনই সকালে মারা গেছেন। খবরটা শুনে ভোলানাথের বুকের ভিতরটা ভেঙে যায়। মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। সে দাদার শ্রাদ্ধ শান্তিতে সামর্থ মতো অর্থ বৌদির হাতে তুলে দিয়ে আসে। দাদার শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ শেষ হলে, বৌদি তার ছেলেকে নিয়ে সন্তোষপুরে বাপের বাড়ি চলে যায়। সেখানেই থাকতে শুরু করে। ছেলে সোমনাথকে সন্তোষপুর স্কুলে ভর্তি করে দেয়। সন্তোষপুরে বাবার জমিতে ফ্ল্যাট উঠলে বৌদি সেখানে দুই রুমের একটা ফ্ল্যাট পায়। পল্লিশ্রীর জমিটা বিক্রি করে দেয়। আমাদের পৈত্রিক ভিটা অন্য লোকের কাছে হাত ছাড়া হয়ে যায়।  মনে মনে ভাবে ভোলানাথ, ভালই হয়েছে।

                    মার স্মৃতি চিহ্ন পেয়ারা গাছটাই যখন দাদা কেটে নিজের জন্য পাকা ঘর তুলতে পেরেছিল, তখন জমিটা নিজেদের থাকল কি থাকল না, তা নিয়ে ভোলানাথের এখন আর বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা নেই।

                    সে ভাবল, দাদা থাকার সময়, তার সাথে নানা রকম বিরোধ থাকলেও,  তবু কিছুটা যোগাযোগ ছিল। সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদের সংবাদের আদান-প্রদান ছিল। দাদা মারা যাবার পর, বৌদির সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। তিনিও আর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পছন্দ করতেন না। সেখানে চিঠি লিখলে কোনও উত্তর আসত না। 

                      দাদা বৌদি কিংবা দাদার ছেলে সোমনাথের সঙ্গে স্বপ্নার কোনও পরিচয় হয়নি।

কারণ, ওরা কখনও আমাদের ভাড়া করা বস্তির ঘরে আসত না। এখানে আসতে তাদের সম্মানে লাগত। আমরাও তাদের বাড়িতে যেতাম না। কারণ, তারা সেটা পছন্দ করত না।

স্পষ্ট করে কিছু না বললেও, তাদের সকলের হাব-ভাব আর তাদের আচরণ দেখে তা বোঝা যেত। তাই তাদের বিড়ম্বনায ফেলে তাদের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল ভোলানাথ। 

সে তার বউ মেয়েকে নিয়েই সুখি সংসার গড়ে তুলেছিল।


Uploaded Image

SANKAR BRAHMA.
8/1, ASHUTOSH PALLY,
P.O. - GARIA,
Kolkata - 700 084.

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.