ভূতের পাল্লায়
সমীর কুমার দত্ত
এ পাড়াটা নিস্তব্ধ নিঝুম। কবে থেকে যে পড়ে আছে এ পাড়া ভূতুড়ে পাড়া নামে,কেউ বলতে পারে না। তবে লোকমুখে শোনা যায়, এ পাড়ায় এমন কেউ কেটা বাস করতো এবং তাদের কিছু স্মরণীয় ঘটনা তো আছেই। এটা সাহেব ভূতের পাড়া নামে খ্যাত। কৌতুহল বশতঃ কেউ ওই পাড়ার মধ্যে ঢুকলে আর ফেরে না।, কোথায় মিলিয়ে যায়।আর এ পাড়ার রহস্য থেকেই যায়। তাই কৌতূহল সত্বেও কেউ যাবার সাহস পায় না।এই রহস্যময় পাড়ার রহস্য হলো —পাড়ার আশপাশে বেশ সুন্দর,সাদা ধবধবে অনেক খরগোশকে চলাফেরা করতে দেখা যায়। প্রত্যেকেই প্রলুব্ধ হয় খরগোশগুলোকে দেখে। ধরবার জন্য কেউ ওদের পিছু ধাওয়া করতে করতে একদম পাড়ার ভিতরে চলে যায়। যাওয়ার পর আর তারা ফিরে আসে না। এ পর্যন্ত যতোজন গেছে, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদি কেউ ফিরে আসতো, তাহলে রহস্য উদ্ঘাটিত হতো। মাঝে মাঝে আরও অনেক কিছু প্রতিভাত হয়। যেমন কুঞ্চিত কেশদাম তূষারশুভ্র গাউন পরিহিত গৌরাঙ্গী রমণীকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। আবার কখনও হ্যাট কোট পরিহিত ছড়ি হাতে সাহেবকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। লোকের মুখে মুখে এ পাড়াটা সাহেব পাড়া নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। আসলে ওই পাড়ায় সাহেবরাই বাস করতো। তবে সাহেব , মেমসাহেবদের যারা দেখেছে, তারা আর বেঁচে নেই। সুতরাং বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটা গল্পের মতোই মনে হয়। স্বাধীনতার পরবর্তী যুগে কয়েক পুরুষ সাহেব এই মহল্লায় বাস করতো। তারপর আর ওদের দেখা যায় নি। ওদের উত্তরসূরীরা ইংল্যান্ডে চলে যায়। ওরা আর কেউ ফিরে আসে নি। ফলতঃ জমিসহ ওই বিশাল বাড়ি পোড়ো বাড়িতে পরিণত হয়েছে। কথিত আছে যে এই বাড়ি থেকে মধ্যরাতে পিয়ানো বাজানোর শব্দ নাকি শোনা যেতো। এখনও মাঝে মাঝে শোনা যায়।
তবে বিগত দিনে বহু পুরনো বাসিন্দাদের মুখে মুখে একটা গল্প চলে আসছে যে, ওই বাড়িতে শেষ যারা ছিলেন, তারা হলেন এক সাহেব ও মেমসাহেব।আর এক বৃদ্ধ কেয়ার টেকার। কিছু বিদেশি খরগোশ পোষ্য হিসেবে ছিলো।নিঃসন্তান দম্পতি কলিগদের নিয়ে বহু রাত পর্যন্ত পার্টিতে মদের ফোয়ারা ছোটাতো। ভোর রাত্রে নেশা কেটে গেলে যে যার গাড়ি হাঁকিয়ে চলে যেতো। মদ্যপ অবস্থায় মেমসাহেব সাহেবের কলিগদের সঙ্গে ঢলাঢলি করে তাদের কারোর সঙ্গে জড়াজড়ি করে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতেন। একদিন তেমনি এক পার্টিতে সাহেবের নেশা আগেই কেটে গেলে দেখেন তাঁর মিসেস পরপুরুষের সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। ব্যাস, আর যায় কোথায়।মাথায় চড়ে গেল রক্ত। বৃদ্ধ কেয়ার টেকারকে বললো বন্দুক আনতে। কেয়ার টেকারও নেশায় বুঁদ হয়েছিলো। বন্দুক আনতে দেরি করাতে নিজেই বন্দুক নিয়ে এসে তিন জনকে তিনটে গুলি করে শেষে নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে নিজেকেও শেষ করে দিলো।যা কিছু ঘটলো সব নেশার ঘোরে। কেউ কেউ নাকি ওই গুলির আওয়াজ শুনে ছিলো। পরদিন ব্রিটিশ পুলিশ এসে স্থানীয় কয়েক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বাড়িটি শীল করে দিয়ে চারটে লাশ নিয়ে চলে যায়। তার পর থেকে ওই বাড়িতে কেউ প্রবেশ করেনি। বাড়ির চারপাশের বাউন্ডারির মধ্যেকার অংশ গভীর জঙ্গলে পরিণত হয়। মাঝে মাঝে জঙ্গল ভেদ করে পিয়ানো বাজানোর শব্দ শোনা যায়। আর ওই খরগোশ, বৃদ্ধ কেয়ার টেকার, সাহেব ও তার মিসেসকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। অনেক পথচারী ওই সুন্দর খরগোশ গুলোকে দেখে প্রলুব্ধ হয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করলে, আর ফিরে আসে না।
কিছু উঠতি বেপরোয়া চার পাঁচ জনের একটা ডাকাতের দল এ বাড়ির সম্পর্কে অবহিত হয়ে সম্পত্তির লোভে ঘোঁড়া ছুটিয়ে এক রাতে ওই বাড়িতে হানা দেয়। তারা জঙ্গলে ঘোড়া দাঁড় করিয়ে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকে। পার্শ্ববর্তী লোকজনের ওই বাড়িটি নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। সুতরাং কে ঢুকলো, কে বেরুলো তা নিয়ে কারোর কৌতূহল নেই। মজার ব্যাপার হলো, চার পাঁচ জন উঠতি ডাকাত বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে একটা তীব্র বায়ু প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। ওই উঠতি ডাকাতদের সঙ্গে থাকা বড়ো বড়ো মোমবাতি, যেগুলো তারা জ্বালিয়ে সবকিছু দেখছিলো। সুন্দর সুন্দর আসবাবপত্র দেখে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিলো। সেগুলো খুব সৌখিন ও দুষ্প্রাপ্য। বিক্রি করতে পারলে প্রচুর অর্থাগম হবে। ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে তারা ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ঘরের ঐশ্বর্য দেখে তারা এতই প্রলুব্ধ হয় যে হঠাৎ দরজা বন্ধ হয়ে যাওযার দিকে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। সমস্ত আসবাবপত্রের ওপর ধূলোর মোটা আস্তরণ পড়ে গেছে। তারা মনে মনে ভাবলো সমস্ত আসবাবপত্র এক এক করে নিয়ে যাবে রাতের অন্ধকারে।
তাদের মধ্যে একজন পিয়ানোর রিডে হাত লাগানো মাত্রই পিয়ানো বেজে ওঠে। পিয়ানো বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের অশরীরী আত্মারা আগের মতো যেন জেগে উঠলো। উঠতি ডাকাতের দল ভীত হয়ে পড়লো। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠলো,"এই, এটা তো ভূতের বাড়ি রে!" অপর একজন লিডার গোচের প্রত্যুত্তরে বলে উঠলো, " ধূস, ভূত না ছাই। হয়তো বাদ্যযন্ত্রটা এরকমই।" তারপর তারা একটা গুলির শব্দ শুনতে পেলো। এবার সকলে একটু বেশিই ভয় পেয়ে গেলো। বললো, "চল এখান থেকে পালিয়ে যাই। এটা ভূতের বাড়ি। শেষ কালে বেঘোরে কি প্রাণটা যাবে। সবাই বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। দরজা খুলতে গেলে, দরজা খোলে না। পিছন ফিরে দেখলো হ্যাট কোট পরিহিত হাতে একটা ছড়ি নিয়ে তাদের দিকে জুতোর খট্ খট্ শব্দ তুলে এগিয়ে আসছে। একজন বলে উঠলো, "এই , এ বাড়িতে লোক আছে রে।" আর একজন বললো, "ধূস, ও বুড়ো কী করবে? আমরা এতোজন আছি না।" এবার সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই যে মূর্তিটা যতো এগিয়ে আসছে ততোই দীর্ঘ দেহী হয়ে যাচ্ছে। ওদের তো আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম হলো। এবার তারা সকলেই ভয়ে ঘামতে শুরু করলো। তারা একদৃষ্টে ওই মূর্তিমানের দিকে তাকিয়ে রইলো।
কিন্তু আরও মজার ব্যাপার হলো ,মূর্তিটা যেন আসছে তো আসছেই। তাদের কাছে এসে আর পৌঁছাচ্ছে না। তারপর তারা দেখলো সাদা গাউন পরিহিত এক সুন্দরী নারীকে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে । একজন বলে উঠলো, "মেমভূত ! এই দিকেই এগিয়ে আসছে।" বাকিদের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারছে না। মনে মনে ভাবলো এ কী ভূতের পাল্লায় পড়লুম রে বাবা। তাদের এখন ছেড়ে দে মা পালিয়ে বাঁচি অবস্থা। হ্যাট কোট পরা সাহেব আর সুন্দরী মেমসাহেব হাঃ---হাঃ--করে অট্টহাস্য করতে লাগলো। বললো," হোয়ার আর ইউ গোয়িং, মাই বয়েজ? নো ওয়ান ক্যান গো ব্যাক। ইউ মাস্ট ডাই। ওয়ান হু এন্টার দিস রুম, ক্যান নেভার গো ব্যাক। স্ট্যান্ড ইন এ কিউ। উই উইল স্যুট ইউ ওয়ান বাই ওয়ান।" সবাই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইলো। একটা গুলির আওয়াজ হলো। আঃ, করে চিৎকার শোনা গেলো। আবার গুলির শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোহিত চিৎকার করে বিছানা থেকে নীচে পড়ে গেলো। বাড়ির লোকজন রোহিতের চিৎকার শুনে ছুটে এসে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে দেখলো রোহিত নীচে পড়ে আছে। জিজ্ঞাসা করলো," কি হয়েছে চিৎকার করলি কেন?নীচেই বা পড়ে গেলি কী করে? বাড়ির আর একজন বলে উঠলো," স্বপ্ন দেখেছিস বুঝি?" রোহিতের সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে গেছে।সবার কথা শেষ হলে রোহিত বলে,
" আমার গুলিটা তাহলে লাগেনি।" কিছুক্ষণ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শুধু বললো,
"এক গ্লাস জল দাও তো।"
=========================
Samir Kumar Dutta
Pune, Maharashtra
Mobile no.9051095623(Mobile no)

