আশ্চর্য মূর্তির প্রত্যাবর্তন
অঞ্জনা মজুমদার
সায়নের হাতে একটা মূর্তি, যার মাথাটা হাতির আর দেহটা সিংহের মতো। থাবাওয়ালা চারটে নখযুক্ত পা আর লম্বা একটা লেজ। মূর্তির চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। বোঝা যায় চোখদুটো বিশেষ কোনও পাথরে তৈরি যা আলোতে তো বটেই অন্ধকারেও জ্বলে। সায়ন দেখলো চোখদুটো সায়ন যেদিকে নড়ছে সেদিকেই তাকাচ্ছে। এটাই সবচেয়ে আকর্ষণ মূর্তিটার।
সায়ন জানতে চাইলো, কত দেবো মুস্তাফিবাবু?
মনে মনে ভেবেছে মূর্তিটা নিতেই হবে। ওটা যেন বলছে আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো সায়ন।
মুস্তাফিবাবু বললেন, জিনিসটা কিন্তু একেবারেই অসাধারণ। সায়নবাবু আপনি আমার রিলায়েবল্ কাস্টমার তাই আপনাকেই প্রথমে দেখালাম। আপনি পনেরো নয় দশহাজারই দেবেন।
একজন অবাঙালি ক্রেতা ঢুকলেন। ঢুকেই মূর্তিটার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, এটার কত দাম, আমি এটা নিতে চাই।
মুস্তাফিবাবু বললেন, কিন্তু এটা তো বিক্রি হয়ে গেছে।
ভদ্রলোক হতাশ হয়ে বললেন, আউর এক পিস নেই? আপনি যা দাম চাইবেন দেবো। নয়তো এটাই দিয়ে দিন,আমি বেশি দাম দেবো।
মুস্তাফিবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, বললাম তো এটা বিক্রি হয়ে গেছে। সায়নকে দেখিয়ে বললেন, এটা ইনি কিনেছেন। আপনি অন্য কিছু দেখুন।
সায়ন অনলাইন পে করে দিল। মুস্তাফিবাবু মূর্তিটা প্যাক করে দিলেন।
ভদ্রলোক হতাশ হয়ে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন সায়নের দিকে তাকাতে তাকাতে।
আর অফিসে না ফিরে বাড়ি ফিরে এল সায়ন। সে লালবাজার সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টে আছে। নিউটাউনে একটা তিন বেড রুমের ফ্ল্যাটে সে তার বন্ধু শানের সঙ্গে থাকে। শান কলেজে পড়ায়। দুজনে সেই প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু। আর থাকে দামুদাদা তাকে সায়নের মা গ্রামের বাড়ি থেকে পাঠিয়েছেন দুই বন্ধুর খেয়াল রাখতে। সে দরকার মতো শাসনও করে দুজনকে।
বাড়ি ফিরেই বাইরের ঘরে দুই বন্ধু প্যাকেটটা খুলে মূর্তিটা বের করে টেবিলে রাখল। শান বলল, সত্যি সত্যিই খুব আশ্চর্য রকমের মূর্তি। দামুদাদা চা দিতে এসে চমকে উঠলো। হাত থেকে চায়ের ট্রেটা ফসকে যাচ্ছিল। কোনওমতে সামলে নিয়ে বলল, এটা কি এনেছো সায়নদাদা? আমাকে যেন নজরে নজরে রাখছে।
সায়ন হেসে উঠলো, বেশ হবে কেবল তুমি আমাদের নজরে নজরে রাখবে? বলে মূর্তিটা বুক সেলফের ওপর তুলে রেখে বলল, খেতে দাও দামুদাদা।
দুজনে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসল। আজ চিকেন আর রুটি। শেষ পাতে রসগোল্লা। দামুদাদা একটা বাটিতে খানিকটা দুধ আর একটা রসগোল্লা নিয়ে বাইরের ঘরে যাচ্ছে দেখে শান বলল, দুধ মিষ্টি কি হবে দামুদাদা?
দামুদাদা যেন ঘোরের মধ্যে বলল, আমরা খাবো ওনাকে না খেতে দিলে যদি রাগ করেন?
দুই বন্ধু মুচকি হেসে খেতে লাগলো। খাওয়া দাওয়া সেরে দুজনে শোয়ার ঘরে ঢুকে পড়লো। দুই বন্ধু একই ঘরে দুটো আলাদা বিছানায় ঘুমায়।
রাত নিঝুম হলে সবাই যখন ঘুমিয়ে, একটা অদ্ভুত আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল সায়নের। কে যেন ব্যাথায় কাতরাচ্ছে। পাশের খাটের নড়াচড়ায় বুঝতে পারল শানও জেগে গেছে।
দামুদাদার পাতলা ঘুমও ভেঙে গেছে বোঝা গেল তার গলার আওয়াজে, কে, কার কি হয়েছে?
সায়ন বালিশের তলা থেকে তার সার্ভিস রিভলবার হাতে নিয়ে বাইরের ঘরে এসে আলো জ্বালাল।
একি? একটা লোক মেঝেতে পড়ে কাতরাচ্ছে। তার হাত দুটো কেউ যেন মুচড়ে দিয়েছে। মূর্তিটা মেঝেতে পড়ে, লোকটার পায়ে নখের আঁচড়ানোর দাগ। সেগুলো থেকে রক্ত পড়ছে।
দামুদাদা হতবাক, দরজা তো আমি নিজে বন্ধ করেছি। এ লোকটা ঢুকলো কেমন করে?
সায়ন রিভলবার তাক করে বলল, কেন ঢুকেছিস আমাদের বাড়িতে?
লোকটার চোখে ভয়, তাকিয়ে আছে মূর্তিটার দিকে। কাতরাতে কাতরাতে বলল, হাতি আমার হাত ভেঙে দিয়েছে আর সিংহ আমাকে আঁচড়ে দিয়েছে। জানতাম না এ বাড়িতে হাতি আর সিংহ দুটোই পোষা। টাকার জন্য মূর্তিটা চুরি করতে এসে আমি মরেই যেতাম। আমাকে বাঁচাও বাবু।
শান বলল, কে পাঠিয়েছে তোকে?
দুই হিন্দুস্তানী বাবু একহাজার টাকা দিয়েছে। মূর্তিটা নিয়ে যেতে পারলে পাঁচহাজার দেবে বলেছে। আমার টাকা চাইনা আমাকে বাঁচাও সাহেব।
সায়ন থানায় ফোন করেছে। অফিসার বললেন, স্বয়ং ডিটেকটিভ এর বাড়িতে চোর? কি চুরি করতে এসেছে স্যর?
দামুদাদা এতক্ষণে রেগে মূর্তিটার দিকে হাত দেখিয়ে বলল, সব ওই মূর্তির জন্য। দেখ দাদাবাবু আমি দুধ রসগোল্লা খেতে দিয়েছিলাম। সবটুকু চেটেপুটে খেয়েছে। এই মূর্তি জ্যান্ত, একে ঘরে না রেখে মন্দিরে দিয়ে দাও। মা কালীই ওকে সামলাতে পারবে।
অফিসার অবাক হয়ে মূর্তিটা দেখে বললেন, এমন মূর্তি আমি আগে কখনও দেখিনি। আপনাদের কমপ্লেক্সে একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আছেন, প্রফেসর ডঃ সোমনাথ সরকার। প্রাচীন মূর্তির বিষয়ে উনি বলতে পারবেন। আমি বরং তাকে ডেকে নিই, কি বলেন স্যর?
শান বলল,প্রফেসর ডঃ সরকার আমাদের কমপ্লেক্সে থাকেন? চলুন,আমিও যাই তাকে ডাকতে।
চোরটিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হসপিটালে পাঠিয়ে অফিসার আর শান ডঃ সরকারের ফ্ল্যাটে কলিং বেল বাজালেন। রাত জেগে পড়াশোনা করেন প্রফেসর। পূর্ব পরিচিত অফিসারকে দেখে বললেন, কি ব্যাপার বিমান, এতো রাতে এসো বসো,খুব দরকার?
শান বলল আপনাকে রাতে বিরক্ত করছি তবু কেবলমাত্র আপনিই বুঝতে পারেন তাই এলাম।
বিষয়টা বিশদে শুনে কাজের লোককে বললেন, রামু দরজাটা বন্ধ করে দে। আমি দেখে আসি বিমান কি বলছে।
তিনজনে সায়নদের ফ্ল্যাটে এসে মূর্তিটা একঝলক দেখেই নিজের মোবাইল খুলে একটা ছবি বের করলেন।
দেখো বিমান এই দুটো একই মূর্তি তো?
সায়ন, শান ও অফিসার বিমান একসাথে বলে উঠল, একই তো! এ ছবি আপনি কোথায় পেলেন?
প্রফেসর সরকার বললেন, গত মাসে মিজোরামের মিউজিয়াম থেকে মূর্তিটি মিসিং হয়। এটি এক লুপ্তপ্রায় উপজাতিদের দেবতার মূর্তি। ওই মিউজিয়ামের একজন গার্ডকে চোর ভাবা হয়েছিল কিন্ত সে অ্যাক্সিডেন্টে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছে। যেখানেই খোঁজ পাওয়া যেতে পারে সেখানেই কোনও না কোনও দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ভারতীয় যাদুঘর এর গোয়েন্দা বিভাগ এর খোঁজ করে চলেছে। ওদের কাছে খবর ছিল মূর্তিটি কলকাতায় এসেছে। বিদেশে পাচার করার চেষ্টা চলছিল।
সায়ন আচ্ছন্নের মতো বলল, আমাকে যিনি বেচেছেন তিনি নিতান্তই সাধারণ ডিলার। উনি চোরাকারবারি নন। আমি পুলিশ জেনেই বেচেছেন। আমাকেই যেন কানে কানে বলল মূর্তিটি কিনে নিতে। হয়তো মূর্তিটি তার সঠিক জায়গায় ফিরে যাক তাই চাইছিল কেউ।
প্রফেসর বললেন, ঠিক বলেছো ভারতীয় যাদুঘরই এর সঠিক স্থান।
সায়ন বলল, আমি কালই মিউজিয়াম কতৃপক্ষের হাতে মূর্তিটি তুলে দেবো। আজই মেল করে দিচ্ছি।
পরদিন দুপুরে মিউজিয়াম এর ডিরেক্টর, লালবাজারের কমিশনার, প্রফেসর ডঃ সরকার আর অফিসার বিমানের উপস্থিতিতে সেই আশ্চর্য মূর্তি মিউজিয়ামে স্থানান্তরিত হল। সায়ন আর শান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দামুদাদা দুই হাত মাথায় ঠেকিয়ে বলল, যাক দেবতা নিজের জায়গায় ফিরে গেছেন। সবার ভালো হবে।
==========================
অঞ্জনা মজুমদার
এলোমেলো বাড়ি
চাঁদপুর পল্লী বাগান
পোঃ রাজবাড়ি কলোনী
কলকাতা ৭০০০৮১

