পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
মিঠুন মুখার্জী
তখন তপন এম.এ দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। ২০১০ সালের শেষের দিকের ঘটনা। শীতকাল। তপন তার চেনা পরিচিত ছয় জনের সঙ্গে পুরুলিয়ায় ঘুরতে গিয়েছিল। হীরক, চম্পা ও সম্পা এই ভ্রমণের সঙ্গী ছিল। তিনজনই তপনের বন্ধু ছিল। এছাড়া আঁখি দি, রূপালী দি ও আঁখি দির মেয়ে মারিশা তপনদের সঙ্গে গিয়েছিল। রূপালী দিদির দিদি সোনালী দীর্ঘ পাঁচ বছর চাকরি সূত্রে পুরুলিয়ার এক কয়লা খনির কাছেই একটা কোয়ার্টারে থাকেন। তপন এর আগে কখনো পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় যায় নি। এ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা । দুই দিন প্রচন্ড ঠান্ডায় পুরুলিয়ায় তারা ছিল। জয়চন্ডী পাহাড়ে সকলে মিলে ঘুরতে গিয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি এমন একটি দিন তাদের দেখতে হবে।
হাওড়া থেকে দুপুর বেলা ট্রেন ধরে তপনেরা পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল। হাওড়া প্লাটফমে যখন তপনেরা সকলে ট্রেনে উঠছিল তখন মারিশার ব্যাগ থেকে জাপান থেকে আনা ক্যামেরাটা একজন ব্যক্তি কাকের মত ছো মেরে নিয়ে যায়। মারিশার বয়স তখন দশ। সে খুব কান্না করে। মারিশার মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল--- " কাঁদিস না রে মা। আমাদের কপালেই এমনটা ছিল। বাবা এবার যখন জাপান যাবে, তখন আরেকটি ক্যামেরা এনে দেওয়ার কথা বলব। তুই এখন চুপ কর নতুবা আমাদের ঘুড়তে যাওয়ার আনন্দটা একেবারে মাটি হয়ে যাবে।" মনের কষ্টে মারিশা ঘুমিয়ে পড়েছিল। এরা সকলেই এই প্রথম পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় ভ্রমনে গিয়েছিল। ট্রেন চলা শুরু করলে তপনের খুবই আনন্দ হচ্ছিল এই ভেবে যে, কতদিন বাদে একঘেয়ে জীবনকে ছেড়ে নতুন কোনো জায়গার স্বাদ সে গ্ৰহন করবে। ঘন্টা দুয়ের মধ্যে বর্ধমান স্টেশন এসে যায়। মারিশার ঘুম ভেঙে যায়। আঁখি দিও স্বাভাবিক হয়ে যায়। এরপর চলে গানের লড়াই। রকমারি বাংলা ও হিন্দি গান তাদের স্মৃতিকে ভিড় করে ধরে। ঘন্টা খানেক চলার পর খাবার বন্দবস্ত করা হয়। বাড়ি থেকে রুটি, লুচি, পরোটা, আলুর দম, ঘুগনি ও মিস্টি সকলে মিলে এনেছিল। ভাগযোগ করে সকলে তা উদরস্ত করে। ক্ষুধার আগুনকে সেই মুহূর্তে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একটু ঘুম ঘুম ভাব এসেছিল সকলের। নিজের নিজের সিটে সকলেই ঘন্টা দুয়েক শুয়ে ছিল। সকলের চোখ বুজে এলেও একমাত্র জেগে ছিল তপন। ওর ট্রেনে ঘুম আসতে চায় না। দুচোখ বন্ধ করলে মনে হয় এখনি ট্রেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়বে। রাত কিংবা দিন যখনই সে ট্রেনে করে কোথাও যাত্রা করেছে দুচোখের পাতা কখনো এক করতে পারে নি। মনের মধ্যে সবসময় একটা ভয় কাজ করে তার। বিকেল বেলা আবার গল্পে সরগরম হয়ে ওঠে তপনদের বগিটি। রাজনীতি, বোম্বের নায়ক-নায়িকা, লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমারের আলোচনায় সকলে মশগুল হয়ে ওঠে। কথা কাটাকাটি চলে নিজেদের মধ্যে। একসময় সকলে চুপ হয়ে যায়। রাত আটটায় তপনদের ট্রেন বাঁকুড়া স্টেশনে এসে দাঁড়ায়। তপন সকলকে বলে --- " সকলে দেখো বাঁকুড়া স্টেশন। পুরুলিয়া ঘুরে আমরা এখানেই আসব। এখান থেকে বিষ্ণুপুর ঘুড়তে যাব। আমার তো মনে হচ্ছে এখনি ট্রেন থেকে নেমে বিষ্ণুপুর চলে তাই।" দশমিনিট পর বাঁকুড়া স্টেশন থেকে ট্রেনটি ছাড়ে। ট্রেনের গতি ছিল ঘন্টায় একশো থেকে একশো দশ কিলোমিটার। রাত সাড়ে নটা নাগাদ তপনদের ট্রেনটি সাঁওতালডিহি স্টেশনে এসে থেমেছিল। এটি পুরুলিয়া স্টেশনের আগের স্টেশন। প্রচন্ড ঠান্ডা ছিল সেই রাতটা। সোনালী দিদি আগে থেকেই দুটি গাড়ি স্টেশনে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তপনের মনে হচ্ছিল হাত-পা সব বরফ হয়ে যাচ্ছে। চারি দিকে গাঢ় কুয়াশা। রাস্তাঘাট ভালোভাবে দেখা যায় না। তবুও ফগ লাইট জ্বালিয়ে দুজন গাড়িচালক কুয়াশা কেটে রাস্তা দেখে সোনালির কুয়াটারের কাছে এনে দাঁড় করিয়ে ছিলেন। সেই রাত্রে কোনো রকমে খাওয়া-দাওয়া সেরে দুটি ঘরে শোওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মেঝেতে মোটা করে বিছানা করা হয়েছিল। ছেলেদের বিছানা একটি ঘরে আর মেয়েদের আরেকটিতে। ঠান্ডার জন্য সারারাত সেভাবে ঘুম আসে নি কারো। একটা লেপেও সেভাবে শরীর গরম হচ্ছিল না।
পরদিন সকাল থেকে মুষলধারায় বৃষ্টি নেমেছিল। সকাল দশটা পর্যন্ত তপনেরা সকলে কোয়াটারেই ছিল। ছাতি নিয়ে কোয়াটারের পাশের কয়লার খনি দেখতে তপনেরা কজন গিয়েছিল। হাত দিয়ে কয়লার গুড়ো তুলে একে অপরের গায়ে ছুড়ে মারছিল তপনেরা। খুব মজা হচ্ছিল ওদের। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ সরে গিয়ে রোদ উঠেছিল। ফেরার সময় একটা বাড়িতে রস জাল দিচ্ছিল। প্রচন্ড ঠান্ডায় সকলে রসের ট্রের চারপাশে দাঁড়িয়ে গেল। আগুন পোহাতে সকলে তৎপর হয়ে উঠেছিল। খেজুরের রস দেখে কেউই লোভ সামলাতে পারে না। কলকাতায় সেভাবে খেজুরের রস পাওয়া যায় না। তপন একজনকে বলে --- " মাসিমা রস বিক্রি হবে? তাহলে আমরা এক ভাড় রস কিনতাম। টাকা-পয়সার কোনো সমস্যা হবে না। আমাদের ওখানে এখন এই জিনিস খুবই দুষ্প্রাপ্য।" তপনের কথা শেষ হতেই ওই আগন্তুক মহিলা এক ভাড় রস এনে তপনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে ---"তোমরা রস খাও। এরজন্য কোনো পয়সা দিতে হবে না। তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে তোমরা এখানে ঘুড়তে এসেছ। মানে আমাদের অতিথি। এইটুকু রসের জন্য তোমাদের পয়সা দিতে হবে না।" তপন , হীরক,চম্পা, শম্পা ও রুপালি মিলে একভাড় রস মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দিলাম। এরপর প্রত্যেকেই এই মহিলার কাছ থেকে দুই কেজি করে পাটালি গুড় কিনেছিল বাড়ির জন্য। সেদিনের সকালটা সকলেরই খুব আনন্দে কেটেছিল।
দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়া শেষ করে তপনেরা সকলে ও সোনালী দি জয়চন্ডীর পাহাড়ে ঘুড়তে গিয়েছিল। গাড়িতে করে যাওয়ার সময় চারিপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সকলেই মুগ্ধ হয়েছিল । একটা নদীর পাশে প্রথমে গাড়ি দাঁড় করিয়েছিলেন গাড়িচালক। চারিপাশে বড় বড় পাথরের চাঙর পড়ে ছিল। নদীর উপর দিয়ে একটা সাঁকো দুই পাড়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। হীরক মুগ্ধ হয়ে বলে--- " মন একেবারে তৃপ্ত হয়ে গেল। কী অসাধারণ দৃশ্য, দুচোখে না দেখলে কারো মুখ থেকে শুনে ঠিক রসাস্বাদন সম্ভব নয়। পুরুলিয়া ভ্রমণ সফল হল।" তপনেরা এক একজন করে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে বিভিন্ন কায়দায় ছবি তোলে। একঘেয়ে জীবন থেকে বেরিয়ে মাঝে মধ্যে একটু ঘুড়তে না গেলে জীবনের আনন্দটাই থাকে না। দুপুর আড়াইটার সময় সকলে জয়চন্ডী পাহাড়ের কাছে এসে পৌঁছেছিলাম। পাহাড়ের একেবারে উপরে দেবী চন্ডীর মন্দির। সেখানে যাওয়ার জন্য পাথর কেটে কেটে কয়েকশো সিঁড়ি ছিল। তপনদের গাড়ি যেখানে থেমেছিল তার চারিপাশে একটি বিরাট মেলা চলছিল যথাসম্ভব ওই চন্ডী মন্দিরে কোন বিশেষ পুজো উপলক্ষে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছিল অনেক কষ্ট করে মনে সাহস নিয়ে তপনেরা সকলে পাহাড়ের উপরে পৌঁছেছিল তখন অবশ্য মন্দির বন্ধ ছিল এখানে সকাল বারোটার মধ্যে পুজো হয়ে যায় আবার সন্ধ্যেবেলা পুজো হয়। বাইরে থেকেই চন্ডীমাকে নমস্কার করেছিল সকলে মিনিট পনেরো মতো সেখানে কাটিয়ে সকলের নিচে নেমে এসেছিল। মেলা থেকে নিজেদের পছন্দমত কয়েকটা জিনিস কিনেছিল মেয়েরা সন্ধ্যা নেমে এসেছিল এরপর জয়চন্ডী পাহাড় থেকে সকলে পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে যায় সেই গ্রামে ঘরে ঘরে তাঁতের শাড়ি বোনে মেয়ে বউরা। বেশ কয়েকটা বাড়িতে গিয়ে শাড়ি দেখে চম্পা শম্পা সোনালী রূপালী ও আঁখি দি। তারা পছন্দ করে মোট আটটি শাড়ি কিনেছিল এই সমস্ত শালীগুলির দাম কলকাতায় হাজার টাকার কমে হবে না কিন্তু এখানে এক একটি শাড়ির দাম ছিল আড়াইশো টাকা তিনশো টাকা। শাড়িগুলো সকলেরই খুব পছন্দ হয়েছিল থেকে এসে এরকম শাড়ি কিনবে কেউ ভাবতেই পারেনি সন্ধ্যা ছটা নাগাদ সেখান থেকে পুনরায় কোয়াটারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল।সকলে ফেরার পথে রাস্তায় একটা দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল তারা। এই দৃশ্য দেখে কেউ কেউ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সাতটার মধ্যে গন্তব্যে ফিরেছিল সকলে। একে একে হাতমুখ ভালো করে ধুয়ে সকলে ঠান্ডায় কফিতে চুমুক দিয়েছিল।
পরদিন সকাল সকাল স্নান সেরে বাঁকুড়া ও বিষ্ণুপুরের উদ্দেশ্যে তপনেরা যাত্রা করেছিল আগের দিন রাত্রে কিছু কিছু জিনিসপত্র প্রত্যেকে পিঠ ব্যাগে করে নিয়ে নিয়েছিল বাঁকুড়াতে সেই দিন থাকার পরিকল্পনা ছিল তাদের ট্রেনে পুরুলিয়া থেকে বাঁকুড়া স্টেশনে পৌছাতে প্রায় দু'ঘণ্টা সময় লেগেছিল বাঁকুড়া রেলওয়ে স্টেশনে নেমে পাশের একটি হোটেলের দুটি রুম সেই দিনের জন্য বুকিং করেছিল তারা এরপর একটি টাটাসুমো ভাড়া করে সেখান থেকে আপনারা বিষ্ণুপুরে গিয়েছিল একটি ঐতিহাসিক জায়গা হল বিষ্ণুপুর। সেখানকার রাস মন্দির আরো অনেক কিছু দেখার মত ছিল। এই রাস মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন মল্লরাজ বীরহাম্বীর আনুমানিক ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে। সাড়ে বারটার সময় তারা বিষ্ণুপুরে পৌঁছেছিল প্রথমে তারা রাস মন্দিরে গিয়েছিল কি অসাধারণ জায়গা মন ভরে যায়। ঐদিন সন্ধ্যা ছটা থেকে রাস মন্দির চত্বরে একটি বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কলকাতা থেকে রাগ সঙ্গীত পরিবেশন করতে গিয়েছিলেন ওস্তাদ রসিদ খান। রাসমন্দিরে একঘন্টা সময় কাটিয়েছিল তপনেরা। মারিশা মার মোবাইলে অনেক ছবি তুলেছিল। যে যার মতো রাসমন্দিরের ভিতরটা ঘুরে ঘুরে দেখেছিল। শিল্পীদের কী অসাধারণ সব হাতের কাজ। সকলেই এই প্রথম নিজ চোখে বিষ্ণুপুরের রাসমন্দির দেখে। এরপর মল্ল রাজবাড়ি ঘুরতে গিয়েছিল। রাজবাড়ীর অবস্থা খুবই খারাপ। মহাকালের কাছে তার অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এখনো কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে ভগ্ন ধ্বংসাবশেষ রূপ নিয়ে। তপনদের সঙ্গে একজন গাইড ছিল সেই রাস মন্দির ও রাজ বাড়ির ইতিহাস সকলের সামনে তুলে ধরছিলেন তিনি রাজার বাড়ির বহু প্রাচীন একটি গল্প তপনদের বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন---"মল্ল রাজাদের বাড়িতে বহু যুগ আগে দূর্গা পূজার প্রচলন ছিল ভীষণ আরম্ভরের সঙ্গে সেই দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো। রাজ বাড়িতেই ছিল দুর্গা মায়ের মন্দির দুর্গা পুজোয় বলির প্রচলন ছিল প্রতিবছর পশু বলি দেওয়া হতো একবার একটি ছাগল বলি দেওয়ার আগের দিন রাজার ছেলে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে সেই রাজা কে মা দুর্গা রাত্রে স্বপ্নাদেশ দেন পশু বলি বন্ধ করার জন্য। তিনি বলেছিলেন--'আমি কোন বলি চাইনা। এই বলি তুই বন্ধ কর। এ জগতের সকল প্রাণীই আমার সন্তান। তাদের রক্তে আমি কখনো খুশি হতে পারি না।' মায়ের পূজায় তারপর থেকে পশু বলি বন্ধ হয়ে যায় তার পরিবর্তে দলমাদল কামানের তোপের আওয়াজে প্রতিবছর মায়ের পুজো শুরু হতো। আজও সেই পুরাতন রীতি মেনে রাজ বাড়ির উত্তরসূরিরা দুর্গাপুজোর আয়োজন করে থাকে।"
বিষ্ণুপুরের চারিদিকে শুধু মন্দির আর মন্দির। এত মন্দির বাংলার বুকে একসঙ্গে আর কোনো জায়গায় দেখা যায় না। এরপর তপনেরা বিষ্ণুপুরের বেশ কয়েকটি প্রাচীন ঐতিহ্য বহনকারী মন্দির দর্শন করে। প্রতিটি মন্দিরে টেরাকোটার কাজ ছিল দেখার মত। মল্ল রাজারাই এই সকল মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। মন্দির গুলো দেখার পর গাইড তাদেরকে নিয়ে গিয়েছিল দলমাদল কামান দেখানোর জন্য প্রাচীন সেই কামানটি এখনো যত্ন সহকারে রাখা আছে। তার ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা তপনদের শুনিয়েছিলেন তিনি। এরপর সকলের ক্ষুধা নিবারণের জন্য একটি হোটেলে ঢোকা হয় এবং সেখানে সকলে সেদিনের দুপুরের খাবার খায়। খাওয়া দাওয়া শেষ করে তপনেরা টেরাকোটার জিনিসপত্র ঘুরে ঘুরে দেখে। রাসমঞ্চের কিছুটা দূরে রাস্তার দুপাশ দিয়ে বহু দোকান ছিল। পোড়া মাটির বিভিন্ন জিনিসপত্র, মাটির গহনা, পুতুল আরো অনেক রকম প্রয়োজনীয় দ্রব্য সেখানে বিক্রির জন্য ছিল। তপনদের প্রায় সকলেই কমবেশি জিনিসপত্র সেই দোকানগুলো থেকে কিনেছিল। তপন কিনেছিল রবীন্দ্রনাথ ও শ্রীগনেশের একটি করে পোড়ামাটির শোপিস। প্রতিটি জিনিস ছিল অসাধারন সুন্দর।
এরপর সন্ধ্যার সময় সকলে মিলে রাসমন্দিরের দিকে যায়। ওস্তাদ রসিদ খান তখন তার অনুষ্ঠান সবে শুরু করেছেন। তপনের ও আঁখির খুবই প্রিয় শিল্পী ছিলেন রসিদ খান। তারা দুজন ছাড়া বাকিদের রাগসঙ্গীত পছন্দের নয়। তাই বেশিক্ষণ গান শোনা হল না তাদের। তাছাড়া হোটেলে রাত দশটার মধ্যে ফিরতে হবে নতুবা গেট বন্ধ করে দেবে। রাত আটটার সময় তারা বিষ্ণুপুর থেকে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ঠান্ডায় তারা কাঁপতে কাঁপতে গাড়িতে ওঠে। গাড়ির সবকটি কাঁচ তুলে দেওয়া হয়। যাতে ভিতরটা একটু গরম হয় তাই। রাত সাড়ে নয়টায় তপনেরা হোটেলে পৌঁছায়। সেখানে পৌঁছে একটা সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। কোনো খাবার ছিল না হোটেলের ক্যান্টিনে। ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে তারা সকলে হোটেলের কাছের একটি রেস্টুরেন্টে যায়। সেখানে সামান্য কিছু রুটি ও আলুর দম ছিল। সেটুকুই সকলে মিলে ভাগযোগ করে খেয়েছিল সকলে। হোটেলে ফিরতে ফিরতে সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছিল। ম্যানেজারকে বলে যাওয়ায় তারা হোটেলের গেট খোলাই রেখেছিলেন।
পরদিন সকালে টিফিন সেরে সকলে বাঁকুড়া স্টেশনে যায়। গিয়ে শুনি কোনো ট্রেন চলছে না। ট্রেন না চলার কারণটা তপনেরা জানতে পারে নি। ছয়ঘন্টা স্টেশনে বসে থাকতে হয় তাদের।তারপর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয় । বিকেল চারটেয় তারা পুরুলিয়ায় পৌঁছায়। সেইদিন রাতটা সেখানে ঠান্ডার মধ্যে কোনওক্রমে তারা কাটিয়ে দেয়। কলকাতার থেকে পুরুলিয়ার ঠান্ডা অনেক বেশি। রাতে প্রত্যেকে তাদের লাগেজপত্র ঠিকঠাক গুছিয়ে নেয়। পরদিন সকাল দশটার হাওড়াগামী ট্রেন ধরার তাড়া থাকবে বলে কোনো কাজই কেউ ফেলে রাখে না।
পরদিন সকালে বিদায়ের পালা। সোনালী দির চোখে জল। নিজের বাড়ির কাছের মানুষেরা ও বোন বাড়ি ফিরবে কিন্তু সে যেতে পারবে না। কাজের কাছে তার হাতদুটো বাঁধা। তার চোখে জল দেখে তপনদের সকলের চোখের জলও বাঁধ মানে না। শম্পা ও চম্পা বলে --- "দিদি এবার বাড়ি গেলে আমাদের প্রত্যেকের বাড়ি ঘুরতে যাবে। এই কদিন তোমায় খুব কষ্ট দিলাম। আবার দেখা হবে।" আঁখি দি বলে --- " সোনালী তুমি কলকাতায় গেলে আমার বাড়ি যেতে ভুলো না। তুমি ছিলে বলে আমাদের পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া ভ্রমণ এতসুন্দর হল। খুব ভালো লাগলো। এখানকার মানুষও খুব ভালো।" এরপর লাগেজ একটা বুলেরো গাড়ির পিছনে নিয়ে সকলে গাড়িতে গিয়ে বসে। গাড়ি ছেড়ে দেয়। স্টেশন যাওয়ার পথে সকলের মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। সকলের মন বলে ওঠে --- " সাধ মিটল না। আবার সময় নিয়ে আসব। এবার সময়ের অভাবে যেগুলো দেখা থেকে বঞ্চিত হলাম সেবার সেগুলো দেখবই। "
====================
মিঠুন মুখার্জী
C/O-- গোবিন্দ মুখার্জী
গ্ৰাম : নবজীবন পল্লী
পোস্ট+থানা -- গোবরডাঙা
জেলা -- উত্তর ২৪ পরগণা
পিন-- 743252
মোবাইল: 9614555989

